বন্ধুরা, আজকালকার ছেলেমেয়েদের জীবন কি সহজ? তাদের জীবনে কত চাপ, কত প্রতিযোগিতা, আর এই ডিজিটাল দুনিয়ার চ্যালেঞ্জ তো আছেই! এমন পরিস্থিতিতে তাদের পাশে একজন সঠিক পথপ্রদর্শক থাকাটা কতটা জরুরি, বলুন তো?

আমরা সবাই চাই আমাদের তরুণ প্রজন্ম সুস্থ মন নিয়ে বেড়ে উঠুক, তাদের পথচলা মসৃণ হোক। আর ঠিক এই কারণেই ‘যুব পরামর্শদাতা’ বা Youth Counselor-এর ভূমিকাটা এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধুমাত্র মনের কথা শোনার চেয়েও বেশি কিছু, এটা একটা বিশেষ দক্ষতা এবং পেশাগত দায়িত্ব। সাম্প্রতিক তথ্যগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, এই পেশার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে এবং এর গুরুত্বও অনেক বেশি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে এই ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন ব্যাপক। এই পেশার ভবিষ্যৎ যে কতটা উজ্জ্বল এবং সামাজিক প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী, তা নিয়ে আজকাল সর্বত্রই আলোচনা চলছে। তাহলে, চলুন, এই আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি সম্পর্কে আরও গভীর ভাবে জেনে নেওয়া যাক। এই পথ কীভাবে আপনার ভবিষ্যৎ গড়তে পারে, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে জানাবো!
যুবাদের পাশে দাঁড়ানোর নতুন দিগন্ত: যুব পরামর্শদাতা
যুবাদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আজকালকার ছেলেমেয়েরা সত্যিই এক অন্যরকম সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তাদের জীবনে যেমন রয়েছে অসীম সম্ভাবনা, তেমনই রয়েছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। পড়াশোনার চাপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা – সব মিলিয়ে তাদের মনোজগতে এক অস্থিরতা প্রায়শই দেখা যায়। এই সময়টায় তাদের পাশে একজন নির্ভরযোগ্য মানুষ থাকাটা বড্ড জরুরি, যে শুধু মনের কথা শুনবে না, বরং সঠিক পথটাও দেখাবে। আর ঠিক এই কারণেই ‘যুব পরামর্শদাতা’ বা Youth Counselor-এর ভূমিকাটা এখন সোনার খনি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি নিজে যখন প্রথম এই পেশা সম্পর্কে জানতে পারি, তখন মনে হয়েছিল, ইসস!
যদি আমার কৈশোরে এমন কেউ পাশে থাকত! এই পেশা শুধু একটি চাকরি নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব এবং তরুণ প্রজন্মকে আগামীর জন্য প্রস্তুত করার এক অসাধারণ সুযোগ। আমার বিশ্বাস, এই পেশা শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের সমাজ গঠনেও বিশাল ভূমিকা পালন করবে। একটা সঠিক পরামর্শ একটা জীবন বদলে দিতে পারে, আর সেটাই এই পেশার সবচেয়ে বড় শক্তি।
যুবাদের মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, আজকের যুবাদের মধ্যে মানসিক চাপ এতটাই বেড়েছে যে অনেকেই বুঝতে পারে না, কোথায় গেলে বা কার কাছে গেলে তারা নিজেদের কষ্টগুলো বলতে পারবে। পরীক্ষায় ভালো ফল করা থেকে শুরু করে বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক, এমনকি নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়েও তাদের মনে অসংখ্য প্রশ্ন আর সংশয় থাকে। অনেক সময় মা-বাবাও হয়তো তাদের অনুভূতিগুলো পুরোপুরি ধরতে পারেন না, কারণ প্রজন্মের ব্যবধান একটা বড় কারণ। এমন পরিস্থিতিতে একজন যুব পরামর্শদাতা তাদের জন্য যেন এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তারা শুধুমাত্র সমস্যা শুনে সমাধান বাতলে দেন না, বরং যুবাদের শেখান কীভাবে তারা নিজেরাই নিজেদের সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে, নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে পারে। আমার মনে হয়, যেকোনো সমাজকে সুস্থ রাখতে হলে তার তরুণ প্রজন্মের মানসিক সুস্থতা সবার আগে জরুরি।
পেশার ক্রমবর্ধমান চাহিদা
আপনি যদি সাম্প্রতিক প্রবণতাগুলো দেখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন যে যুব পরামর্শদাতা পেশার চাহিদা কতটা বাড়ছে। শুধু শহরে নয়, মফস্বল এমনকি গ্রামেও এখন এই পেশার কদর বাড়ছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাতেও এই ধরনের পেশাদারদের নিয়োগ করা হচ্ছে। অনেক পরিবার তো ব্যক্তিগতভাবেও পরামর্শদাতার সাহায্য নিচ্ছেন। কারণ সবাই বুঝতে পারছে যে, অল্প বয়স থেকেই যদি সঠিক মানসিক সহায়তা না পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তা বড় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। আমার মনে হয়, এই পেশার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল এবং যারা মন থেকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান, তাদের জন্য এটি একটি দারুণ সুযোগ।
কেন এখন এই পেশা এত জরুরি? মনের কথা শোনার চেয়েও বেশি কিছু
আমরা সবাই জানি, গত এক দশকে আমাদের চারপাশের জগৎটা কতটা দ্রুত বদলেছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সবকিছু আমাদের হাতের মুঠোয় এলেও, এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও আছে। যুবাদের জীবনে এখন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে, যা হয়তো আমাদের প্রজন্মের সময়ে এত প্রকট ছিল না। সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ, সাইবার বুলিং, ক্যারিয়ার নিয়ে বাড়তি প্রতিযোগিতা, এমনকি বিশ্বায়নের প্রভাবে সংস্কৃতিগত সংঘাতও তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। এমন জটিল পরিস্থিতিতে একজন যুব পরামর্শদাতা কেবল মনের কথা শোনেন না, তিনি একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সমস্যার গভীরে প্রবেশ করেন এবং সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। এটি কেবল একজন বন্ধুসুলভ আলোচনা নয়, বরং এটি একটি পেশাদার পরিষেবা যা যুবাদের সার্বিক বিকাশে সাহায্য করে। আমার মনে হয়, যুবাদের কেবল উপদেশ দিয়ে নয়, বরং তাদের শক্তিগুলোকে চিনিয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
ডিজিটাল দুনিয়ার নতুন চ্যালেঞ্জ
আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের জীবনে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট এতটা প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েদের জীবনটা যেন একটা স্ক্রিনের মধ্যে আটকে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা সারাক্ষণ অন্যদের জীবন দেখে, নিজেদের জীবনের সাথে তুলনা করে আর এই তুলনা অনেক সময় তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। সাইবার বুলিং তো এখন এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছে, যা অনেক যুবাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাছাড়া, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে তারা অনেক সময় এমন সব তথ্যের সংস্পর্শে আসে, যা তাদের বয়স বা মানসিক প্রস্তুতির জন্য উপযুক্ত নয়। এই সব বিষয় তাদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, এমনকি একাকীত্বও তৈরি করতে পারে। একজন যুব পরামর্শদাতা এখানে একজন দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করেন, যিনি যুবাদের শেখান কীভাবে ডিজিটাল জগতের ভালো দিকগুলো গ্রহণ করে খারাপ দিকগুলো এড়িয়ে চলতে হয়।
পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ
শুধু ডিজিটাল দুনিয়ার চাপ নয়, পরিবার এবং সমাজের প্রত্যাশাও যুবাদের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। মা-বাবা চান তাদের সন্তান পড়াশোনায় ভালো ফল করুক, একটা ভালো চাকরি পাক। শিক্ষকরাও চান তাদের ছাত্রছাত্রীরা সেরাটা দিক। এই সব প্রত্যাশা তাদের ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আমি দেখেছি, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীও শুধু এই চাপের কারণে তাদের স্বাভাবিক পারফরম্যান্স দিতে পারে না। এমনকি ক্যারিয়ার পছন্দের ক্ষেত্রেও তাদের উপর এক ধরনের চাপ থাকে। সমাজ কী বলবে, লোকে কী ভাববে, এই সব চিন্তা তাদের নিজেদের পছন্দগুলোকে বিসর্জন দিতে বাধ্য করে। একজন যুব পরামর্শদাতা এখানে যুবাদের নিজেদের মূল্যবোধ চিনতে, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী পথ বেছে নিতে সাহায্য করেন, যা তাদের একটি সুস্থ ও সুখী জীবন গড়তে অত্যন্ত জরুরি।
একজন ভালো পরামর্শদাতার গুণাবলী: শুধু জ্ঞান নয়, চাই সহানুভূতি
একজন সফল যুব পরামর্শদাতা হতে গেলে শুধু ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট থাকলেই হবে না, কিছু বিশেষ গুণাবলী থাকা চাই যা মানুষকে মুগ্ধ করবে এবং তাদের আস্থা অর্জন করতে সাহায্য করবে। আমি নিজে যখন পরামর্শদানের কাজ শুরু করি, তখন বুঝতে পারি যে, বইয়ের জ্ঞান এক জিনিস, আর বাস্তব ক্ষেত্রে মানুষের সাথে মিশে কাজ করা আরেক জিনিস। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একজন পরামর্শদাতার মধ্যে গভীর সহানুভূতি থাকতে হবে। যুবাদের সমস্যাগুলোকে তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারা, তাদের অনুভূতিগুলোকে সম্মান করা, এই গুণগুলো ছাড়া কোনো পরামর্শদাতাই সফল হতে পারবেন না। তাছাড়া, নির্ভরযোগ্যতা এবং গোপনীয়তা বজায় রাখাটাও খুব জরুরি। কারণ, যুবকরা তখনই মন খুলে কথা বলবে যখন তারা অনুভব করবে যে তাদের কথাগুলো সুরক্ষিত থাকবে। এই গুণগুলো একজন পরামর্শদাতাকে কেবল একজন পেশাদার নয়, বরং একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো করে তুলে।
সক্রিয় শ্রোতা হওয়া
পরামর্শদানের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সক্রিয়ভাবে অন্যের কথা শোনা। আমি দেখেছি, অনেকে কথা বলার চেয়ে উপদেশ দিতে বেশি ব্যস্ত থাকে। কিন্তু একজন ভালো পরামর্শদাতা জানেন যে, সমাধানের অর্ধেকটা বেরিয়ে আসে যখন আপনি মন দিয়ে অন্যের কথা শোনেন। যুবারা যখন কথা বলে, তখন তাদের শারীরিক ভাষা, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, এমনকি তাদের নীরবতার মধ্যেও অনেক অব্যক্ত কথা লুকিয়ে থাকে। একজন সক্রিয় শ্রোতা হিসেবে পরামর্শদাতা এই সব সূক্ষ্ম বিষয়গুলো খেয়াল করেন এবং বোঝেন। তাদের কথাগুলো শুধু কানে শোনা নয়, বরং হৃদয় দিয়ে অনুভব করা, এটাই একজন সফল পরামর্শদাতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
নির্ভরযোগ্যতা ও গোপনীয়তা
একজন যুব পরামর্শদাতার জন্য বিশ্বস্ততা এবং গোপনীয়তা রক্ষা করা খুবই জরুরি। আমি যখন কাজ করি, তখন যুবাদের সাথে এমন একটা সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করি, যাতে তারা আমাকে তাদের সবথেকে ব্যক্তিগত কথাগুলোও নির্দ্বিধায় বলতে পারে। তারা যখন জানে যে তাদের কথাগুলো গোপন থাকবে এবং আমি তাদের পাশে সবসময় থাকব, তখন তারা আরও বেশি খোলামেলা হয়। এই পেশায় বিশ্বাস স্থাপন করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সবচেয়ে বড় অর্জন। একবার যদি এই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তাহলে সেই সম্পর্ক আর জোড়া লাগানো খুব কঠিন। তাই, প্রতিটি মুহূর্তে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং তাদের গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াটা অত্যন্ত আবশ্যক।
সমস্যার গভীরে প্রবেশ করা
অনেক সময় যুবাদের সমস্যাগুলো উপর থেকে দেখে যা মনে হয়, আসলে তার গভীরে অন্য কিছু লুকিয়ে থাকে। একজন ভালো পরামর্শদাতা কেবল উপরের স্তর দেখে থেমে যান না, বরং তিনি সমস্যার মূলে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন। এর জন্য অনেক সময় প্রশ্ন করতে হয়, আবার অনেক সময় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয় যাতে যুবারা নিজেরাই তাদের সমস্যার আসল কারণটা বুঝতে পারে। এটা অনেকটা ডিটেকটিভের কাজের মতো। একটা ছোট সূত্র ধরে ধরে পুরো রহস্যের সমাধান করা। আমি দেখেছি, যখন কোনো যুবা নিজেই তার সমস্যার মূল কারণটা বুঝতে পারে, তখন তার মধ্যে সমাধানের পথ খুঁজে বের করার একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
পরামর্শদানের বিভিন্ন ক্ষেত্র: শুধু স্কুল-কলেজ নয়, জীবনজুড়ে
অনেকেই মনে করেন যে যুব পরামর্শদাতারা কেবল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে, এই ধারণাটা একেবারেই ভুল। এই পেশার পরিধি এখন অনেক বিস্তৃত। স্কুল-কলেজ তো আছেই, এছাড়াও বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টার, স্বাস্থ্য সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি করপোরেট জগতেও এখন যুব পরামর্শদাতাদের চাহিদা বাড়ছে। কারণ, জীবনের যেকোনো পর্যায়েই একজন মানুষ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে, আর তরুণ বয়স থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের সময় পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জগুলো আরও তীব্র হয়। আমার মনে হয়, একজন যোগ্য পরামর্শদাতা জীবনের প্রতিটি ধাপে যুবকদের পাশে থেকে তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে আরও মসৃণ করে তুলতে সাহায্য করে। এই পেশা সত্যিই বহুমুখী এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভূমিকা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুব পরামর্শদাতাদের ভূমিকা অপরিসীম। তারা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ, সহপাঠীদের সাথে সম্পর্ক, বুলিং, ক্যারিয়ার নির্বাচন এবং ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করেন। আমি দেখেছি, অনেক সময় শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে বা অভিভাবকদের কাছে তাদের সব কথা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে না, কিন্তু একজন নিরপেক্ষ পরামর্শদাতার কাছে তারা অনেকটাই খোলামেলা হয়। স্কুল এবং কলেজগুলোতে নিয়মিত পরামর্শ সেশন আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব। এমনকি, পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমানোর জন্য বিভিন্ন ওয়ার্কশপের আয়োজন করাটাও অত্যন্ত কার্যকর।
কর্পোরেট এবং কমিউনিটি সেটিংসে
শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই নয়, কর্পোরেট জগতে এবং বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারেও যুব পরামর্শদাতাদের চাহিদা বাড়ছে। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও কাজের চাপ, সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক, কর্ম-জীবনের ভারসাম্য নিয়ে নানা ধরনের সমস্যা দেখা যায়। একজন পরামর্শদাতা তাদের এই সমস্যাগুলো সমাধানে সাহায্য করতে পারেন। এছাড়াও, বিভিন্ন এনজিও বা কমিউনিটি সেন্টারে সুবিধাবঞ্চিত যুবাদের জীবন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবিলায় পরামর্শদাতাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমি মনে করি, সমাজের প্রতিটি স্তরেই এই পেশার গুরুত্ব অপরিসীম।
এই পেশায় সফল হওয়ার পথ: কী শিখবেন, কোথায় যাবেন?
যুব পরামর্শদাতা হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে শুধু সদিচ্ছা থাকলেই হবে না, প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের। আমি নিজে যখন এই পথে আসার কথা ভাবি, তখন প্রথমে মনে হয়েছিল, শুধু মনের জোর দিয়ে কি সব হয়?
পরে বুঝলাম, না! এর জন্য নির্দিষ্ট কিছু দক্ষতা অর্জন করা জরুরি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এখন যুব পরামর্শদান নিয়ে কোর্স অফার করছে। সাইকোলজি, সোশ্যাল ওয়ার্ক বা কাউন্সেলিং-এর উপর উচ্চশিক্ষা এই পেশায় আপনাকে অনেকটাই এগিয়ে রাখবে। তবে শুধু পুঁথিগত জ্ঞান নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টার্নশিপ বা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে আপনি হাতে-কলমে অনেক কিছু শিখতে পারবেন, যা আপনাকে একজন দক্ষ পরামর্শদাতা হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
এই পেশায় সফল হতে চাইলে মনোবিজ্ঞান (Psychology), সমাজকর্ম (Social Work) বা কাউন্সেলিং (Counseling) বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকাটা অত্যন্ত সহায়ক। এর পাশাপাশি, বিভিন্ন শর্ট কোর্স এবং ডিপ্লোমা প্রোগ্রামও রয়েছে যা আপনাকে নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করবে। যেমন, শিশু ও কিশোর মনোবিজ্ঞান, পারিবারিক কাউন্সেলিং, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ইত্যাদি। আমি দেখেছি, যারা এই ধরনের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, তারা আরও কার্যকরভাবে যুবাদের সমস্যা মোকাবিলা করতে পারেন। নিয়মিত সেমিনার ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করে নিজেদের জ্ঞানকে হালনাগাদ রাখাও খুব জরুরি, কারণ যুবাদের সমস্যাগুলো প্রতিনিয়ত নতুন রূপ ধারণ করছে।
ব্যক্তিগত দক্ষতা বিকাশ
শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি কিছু ব্যক্তিগত দক্ষতাও এই পেশায় আপনাকে সফল করে তুলবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ধৈর্য, সহানুভূতি, ভালো যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। আমি যখন কাজ করি, তখন বুঝতে পারি যে, প্রতিটি যুবার সমস্যাই আলাদা, তাই প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন করে ভাবতে হয়। নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখা, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট শেখা, এবং নিজের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখাও একজন পরামর্শদাতার জন্য অপরিহার্য। কারণ, আপনি যদি নিজেই মানসিকভাবে সুস্থ না থাকেন, তাহলে অন্যের পাশে দাঁড়ানোটা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই, নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার চেষ্টা করা এই পেশার জন্য খুবই জরুরি।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা: আগামীর সমাজে যুব পরামর্শদাতার ভূমিকা
ভবিষ্যতে যুব পরামর্শদাতা পেশার চাহিদা আরও বাড়বে, এটা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। সমাজের গতিপথ যেদিকে যাচ্ছে, তাতে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সঠিক দিকনির্দেশনা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে নতুন নতুন পেশার সুযোগ যেমন তৈরি হবে, তেমনই যুবাদের মধ্যে নতুন ধরনের মানসিক চাপও বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে একজন সহানুভূতিশীল এবং দক্ষ যুব পরামর্শদাতা তাদের জন্য এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন। এই পেশা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির পথ নয়, বরং একটি সুস্থ ও শক্তিশালী সমাজ গড়ার ক্ষেত্রেও বিশাল অবদান রাখবে। আমার বিশ্বাস, আগামী দিনে প্রতিটি স্কুল, কলেজ এবং কর্মস্থলে যুব পরামর্শদাতা অপরিহার্য হয়ে উঠবেন।
প্রযুক্তির সাথে সংমিশ্রণ
ভবিষ্যতে প্রযুক্তির সাথে পরামর্শদানের সংমিশ্রণ আরও বাড়বে। অনলাইন কাউন্সেলিং প্ল্যাটফর্ম, মানসিক স্বাস্থ্য অ্যাপস এবং এআই-নির্ভর টুলসগুলো পরামর্শদাতাদের কাজকে আরও সহজ এবং আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। আমি দেখেছি, অনেক যুবা সরাসরি একজন পরামর্শদাতার সাথে কথা বলতে দ্বিধা বোধ করে, কিন্তু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তারা আরও বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে। তবে, প্রযুক্তির ব্যবহার হলেও মানবিক স্পর্শ এবং সহানুভূতি কখনোই এর বিকল্প হতে পারে না। একজন পরামর্শদাতা হিসেবে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং তাদের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করাটা এখন সময়ের দাবি।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব
শুধুমাত্র আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই যুবকদের মানসিক স্বাস্থ্য একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সরকারগুলো এই বিষয়ে বিশেষ নজর দিচ্ছে। এর ফলে, যুব পরামর্শদাতা পেশার গুরুত্ব বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আরও বাড়ছে। ক্রস-কালচারাল কাউন্সেলিং এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এই পেশার নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। আমি মনে করি, যারা এই পেশায় আসতে চান, তাদের জন্য এটি একটি দারুণ সুযোগ, যেখানে তারা শুধু দেশের মধ্যে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাদের দক্ষতা এবং জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারবেন।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা: যুবদের সাথে কাজ করার আনন্দ
বন্ধুরা, যুব পরামর্শদাতা হিসেবে আমার যাত্রাপথটা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সত্যি বলতে, এই পেশায় আসার আগে আমি কখনোই ভাবিনি যে মানুষের জীবনে এত গভীরভাবে প্রভাব ফেলা যায়। যখন একজন যুবা তার সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসে, হতাশ আর বিপর্যস্ত মনে, আর আমি যখন তাকে ধীরে ধীরে সেই অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারি, সেই অনুভূতিটা সত্যিই অন্যরকম। অনেক সময় দেখেছি, একটা ছোট পরামর্শ বা একটা সহানুভূতিশীল কথা তাদের জীবনে কতটা বড় পরিবর্তন এনে দেয়। এই পেশা আমাকে শুধু শেখায়নি কীভাবে অন্যদের সাহায্য করতে হয়, বরং আমাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আর নতুন নতুন মানুষের সাথে মিশে কাজ করার সুযোগ পাওয়াটা সত্যিই অসাধারণ।
| পরামর্শদানের গুরুত্বপূর্ণ দিক | বিবরণ |
|---|---|
| সক্রিয় শ্রবণ | মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা এবং যুবার অনুভূতি বোঝা। |
| গোপনীয়তা রক্ষা | যুবার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং বিশ্বাস তৈরি করা। |
| সহানুভূতি | যুবার দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাকে দেখা এবং তাদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া। |
| সমস্যা সমাধান | যুবাদের নিজেদের সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে সাহায্য করা। |
| জীবন দক্ষতা শিক্ষা | স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, যোগাযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো দক্ষতা শেখানো। |
একটি সফল কেস স্টাডি
আমার মনে পড়ে একবার একটি কিশোরী আমার কাছে এসেছিল, যে পড়াশোনার চাপ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বুলিং-এর কারণে মারাত্মক বিষণ্ণতায় ভুগছিল। তার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব এতটাই প্রকট ছিল যে সে প্রায় কারোর সাথেই কথা বলত না। প্রায় মাস ছয়েক ধরে আমি তার সাথে কাজ করি। প্রথম দিকে সে খুব একটা খোলামেলা ছিল না, কিন্তু ধীরে ধীরে যখন সে আমার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করল, তখন তার পরিবর্তনটা চোখে পড়ার মতো ছিল। আমি তাকে ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে সাহায্য করি, তার শক্তিগুলো চিনিয়ে দিই এবং ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনি। যখন সে স্কুলে ভালো ফল করতে শুরু করল এবং বন্ধুদের সাথে আবার মিশতে শুরু করল, তখন আমার মনে যে আনন্দ হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এই ধরনের অভিজ্ঞতাগুলোই আমাকে এই পেশায় আরও বেশি করে অনুপ্রাণিত করে।
পেশার ব্যক্তিগত তৃপ্তি
আমি যখন কোনো যুবার মুখে হাসি দেখি, যখন তারা এসে বলে, “আপনার পরামর্শ আমার জীবনটা বদলে দিয়েছে,” তখন মনে হয় আমার সব পরিশ্রম সার্থক। এই পেশা আমাকে শুধু জীবিকা নয়, জীবনের এক গভীর তৃপ্তি এনে দিয়েছে। সমাজের জন্য কিছু করতে পারার এই অনুভূতিটা সত্যিই অসাধারণ। আমার মনে হয়, যারা শুধু টাকা রোজগারের জন্য নয়, বরং মানুষের জীবনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে চান, তাদের জন্য যুব পরামর্শদাতা একটি আদর্শ পেশা। এটা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে আপনি প্রতিদিন নতুন কিছু শিখবেন, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করবেন এবং একই সাথে অসংখ্য মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারবেন।
যুব পরামর্শদাতা: আগামীর নেতৃত্বের চালিকা শক্তি
আমার এতদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যুব পরামর্শদাতা শুধুমাত্র একজন পেশাদার নন, তিনি আগামীর নেতৃত্বের অন্যতম চালিকা শক্তি। আজকের যুবকরাই তো আগামী দিনের দেশ এবং সমাজের কর্ণধার। যদি তাদের মন সুস্থ না থাকে, যদি তারা সঠিক পথ নির্দেশনা না পায়, তাহলে কীভাবে তারা নিজেদের সম্পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবে?
আমি যখন কোনো মিটিংয়ে যাই বা কোনো কর্মশালায় অংশ নিই, তখন প্রায়ই এই কথাগুলো শুনি যে, “আমরা চাই আমাদের তরুণ প্রজন্ম মানসিক দিক থেকে শক্তিশালী হোক, তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে শিখুক।” আর ঠিক এই জায়গাতেই একজন যুব পরামর্শদাতার ভূমিকা অনন্য। তারা শুধু সমস্যার সমাধান করেন না, বরং যুবাদের মধ্যে নেতৃত্ব গুণাবলী, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষমতা এবং ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, এই পেশা যত বেশি শক্তিশালী হবে, আমাদের সমাজ তত বেশি সুস্থ এবং সুন্দর হয়ে উঠবে। এটা শুধু একটা পেশা নয়, এটা একটা আন্দোলন, একটা স্বপ্ন, যা তরুণ প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।

আত্মবিশ্বাস এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি
যুব পরামর্শদাতার একটি বড় কাজ হলো যুবাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। আমি দেখেছি, অনেক যুবা নিজেদের যোগ্যতাকে বিশ্বাস করতে পারে না এবং অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একজন পরামর্শদাতা এই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেন। তাদের নিজেদের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে শেখান, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত তা বোঝান এবং পথে আসা বাধাগুলো কীভাবে অতিক্রম করতে হয়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। যখন কোনো যুবা নিজে আত্মবিশ্বাসের সাথে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখে, তখন সেই আনন্দটা আমার কাছে অমূল্য। এটা শুধু তাদের বর্তমানের জন্য নয়, বরং সারা জীবনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিকতা
যুব পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করার সময় আমাদের মধ্যে এক গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে ওঠে। আমি সবসময় মনে করি যে, আমরা শুধু ব্যক্তিবিশেষের সাথে কাজ করছি না, আমরা আসলে একটি বৃহত্তর সমাজের অংশীদার। তাই, আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি পরামর্শ সমাজের উপর একটি প্রভাব ফেলে। এই পেশায় নৈতিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। গোপনীয়তা রক্ষা করা, পক্ষপাতিত্ব না করা, এবং যুবাদের সর্বোত্তম স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া – এই নীতিগুলো সবসময় মেনে চলা উচিত। আমি বিশ্বাস করি, একজন নৈতিক এবং দায়বদ্ধ পরামর্শদাতাই পারেন সমাজের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে। এই পেশা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে শুধু পেশাদারিত্ব বজায় রেখে নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়।
লেখাটি শেষ করছি
বন্ধুরা, যুব পরামর্শদাতা নিয়ে আমার এই দীর্ঘ লেখাটি পড়ে আপনারা হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে, এটি শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, এটি একটি জীবন দর্শন। প্রতিটি তরুণ প্রাণের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পেছনে একজন নিবেদিতপ্রাণ পরামর্শদাতার অবদান অসীম। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই কাজটা আমাকে প্রতিনিয়ত নতুন করে বাঁচতে শেখায়। যখন দেখি একটি ছেলে বা মেয়ে আমার সামান্য সাহায্যে তাদের জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে নিচ্ছে, তখন আমার মন এক গভীর প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে তরুণ প্রজন্মকে এমন একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিই, যেখানে তারা নির্ভয়ে নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।
তাদের পাশে দাঁড়ানোর এই সুযোগটা সত্যি অসাধারণ।
আশা করি আমার এই লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে এবং যুব পরামর্শদাতা পেশা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে পেরেছে।
আমি সবসময় চেষ্টা করি এমন তথ্য নিয়ে আসতে যা আপনাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগবে।
ভবিষ্যতেও এমন আরও অনেক উপকারী টিপস এবং তথ্য নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হব।
জেনে রাখলে কাজে লাগবে এমন কিছু দরকারি তথ্য
১. মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিন: শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগ দেওয়া জরুরি। নিয়মিত মনের যত্ন নিন এবং প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না।
২. খোলামেলা যোগাযোগ: পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন। নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে শিখুন, এতে অনেক মানসিক চাপ কমে যাবে।
৩. ডিজিটাল জগতের সঠিক ব্যবহার: সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। ডিজিটাল স্ক্রিনের বাইরেও বাস্তব জীবনে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন এবং ইতিবাচক বিষয়গুলোতেই বেশি মনোযোগ দিন।
৪. নিজেকে জানুন: আপনার শক্তি এবং দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করুন। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখুন এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী পথ বেছে নিতে শিখুন।
৫. শেখার আগ্রহ ধরে রাখুন: নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন, তা হোক কোনো নতুন দক্ষতা বা শখ। এটি আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং মনকে সতেজ রাখবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এক নজরে
যুব পরামর্শদাতা পেশাটি বর্তমান সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মানসিক সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ গঠনে। এই পেশা কেবল পরামর্শদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি যুবাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জোরদার করা এবং পরিবর্তিত সমাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। একজন ভালো পরামর্শদাতার জন্য সহানুভূতি, সক্রিয় শ্রোতা হওয়া, গোপনীয়তা রক্ষা এবং সমস্যার গভীরে প্রবেশ করার দক্ষতা অপরিহার্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্পোরেট জগৎ পর্যন্ত এর চাহিদা বাড়ছে এবং প্রযুক্তির সংমিশ্রণে ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। এটি এমন একটি পেশা যা ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির পাশাপাশি সমাজের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, যা আগামীর নেতৃত্বের চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: আজকাল যুব পরামর্শদাতাদের এতো প্রয়োজন কেন? কেন তাদের ভূমিকাটা এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে?
উ: সত্যি বলতে কি, বন্ধুরা, এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে যুব পরামর্শদাতাদের প্রয়োজনীয়তাটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমাদের তরুণ প্রজন্ম এখন এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শিক্ষাগত চাপ, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব, জীবনযাপনের ধরন বদলানো আর পারিবারিক নানা সমস্যার কারণে তাদের মানসিক চাপটা অনেক বেড়ে গেছে। শুধু উদ্বেগ, হতাশা নয়, ঘুমের সমস্যা, আচরণে পরিবর্তন—এই সবকিছুই কিন্তু তাদের জীবনে বাড়ছে। পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখবেন, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৬ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১৮ শতাংশই কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। ভাবুন একবার, ১৪ বছর বয়সের মধ্যেই সব মানসিক অসুস্থতার প্রায় অর্ধেকই শুরু হয়ে যায়, অথচ এর বেশিরভাগই হয়তো আমাদের অজান্তেই থেকে যায়!
এমনকি, শিশু ও উঠতি বয়সের তরুণদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মহত্যা। দুঃখের বিষয় হলো, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজে এখনও অনেক ছুঁতমার্গ আছে, যার ফলে অনেকে সাহায্য চাইতে দ্বিধা করেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় দক্ষ পেশাদারদের নাগাল পাওয়াটাও কঠিন। আমি মনে করি, এই কঠিন পরিস্থিতিতে একজন যুব পরামর্শদাতা শুধুমাত্র মনের কথা শোনার জন্য নয়, বরং তাদের ব্যক্তিগত, শিক্ষাগত আর পেশাগত উন্নয়নের জন্য ভীষণ জরুরি। তারা তরুণদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে, লক্ষ্য স্থির করতে আর জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেন। ছোটবেলা থেকেই যদি সঠিক দিকনির্দেশনা পায়, তবে তাদের মন সুস্থ থাকবে, আর এটাই তো সব থেকে বড় কথা, তাই না?
প্র: একজন যুব পরামর্শদাতা আসলে কী কী কাজ করেন? তাদের প্রধান দায়িত্বগুলো কী?
উ: আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একজন যুব পরামর্শদাতা শুধুই উপদেশ দেন না, বরং একজন বন্ধু আর পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেন। তাদের কাজগুলো বহুমুখী। প্রথমেই আসে ব্যক্তিগত পরামর্শ সেশন পরিচালনা করা, যেখানে একজন তরুণ তার মনের কথা খুলে বলতে পারে। এরপর তারা গ্রুপ ওয়ার্কশপ বা কর্মশালার আয়োজন করেন, যেখানে অনেক তরুণ একসাথে তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারে এবং সমাধান খুঁজতে পারে। ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন, মানসিক ও সামাজিক চাহিদাগুলো মূল্যায়ন করা—এগুলোও তাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা তরুণদের জন্য নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিকল্পনা করেন আর সেগুলোর বাস্তবায়নে সাহায্য করেন। শুধু তাই নয়, বাবা-মা আর শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখা, প্রয়োজনে অন্য পেশাদারদের সাথে সমন্বয় করা, সঠিক রিসোর্স আর রেফারেল দিয়ে সাহায্য করা, আর সবথেকে জরুরি হলো, একটা নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করা—এগুলো সবই তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তারা তরুণদের আত্মপরিচয় খুঁজে পেতে, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে, চাপ সামলাতে আর ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে সাহায্য করেন। এক কথায় বলতে গেলে, একজন যুব পরামর্শদাতা তরুণদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার কারিগর।
প্র: যুব পরামর্শদাতা হতে চাইলে কী করতে হবে আর এই পেশার ভবিষ্যৎ কেমন?
উ: যারা তরুণদের পাশে দাঁড়াতে চান, তাদের জন্য এই পেশাটা দারুণ। যুব পরামর্শদাতা হতে চাইলে সমাজকর্ম, মনোবিজ্ঞান, শিক্ষা বা এ ধরনের কোনো বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি থাকাটা জরুরি। আর যদি আগে থেকেই তরুণদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে তো কথাই নেই, সেটা বাড়তি সুবিধা দেয়। তবে শুধু ডিগ্রি থাকলেই হবে না, কিছু বিশেষ গুণও দরকার। যেমন, ভালো যোগাযোগ ও শোনার দক্ষতা, সহানুভূতিশীল ও ধৈর্যশীল মনোভাব, ভিন্ন সংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, আর একা বা দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা। কম্পিউটার চালানো আর রিপোর্ট তৈরির দক্ষতাও এখন খুব দরকারি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তরুণদের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা আর তাদের গোপনীয়তা বজায় রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকা। আমি নিজে দেখেছি, এই পেশার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, কারণ তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব এখন সবাই বুঝতে পারছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি আর সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকে কাজে লাগিয়ে আরও নতুন নতুন পদ্ধতিতে পরামর্শ সেবা দেওয়া হবে, যা তরুণদের জীবনে স্থিতিস্থাপকতা আর সুখ এনে দেবে। সরকারও যুব উন্নয়নের জন্য নানা কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে, যেখানে দক্ষতা উন্নয়ন আর আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তাই আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, যারা এই পেশায় আসবেন, তাদের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল আর একই সাথে তারা সমাজের জন্য অনেক বড় অবদান রাখতে পারবেন।






