আহ, বন্ধুরা! কেমন আছেন সবাই? আশা করি ভালো আছেন!
আজকাল আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ঘিরে কত যে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে, তা আমরা সবাই দেখছি। পড়াশোনা, সামাজিক চাপ, ডিজিটাল বিশ্বের হাতছানি – সবকিছু মিলিয়ে তারা এক অদ্ভুত সময়ে দাঁড়িয়ে। আর এই সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, সঠিক পথ দেখানোর জন্য একদল মানুষের প্রয়োজন, যারা হবেন তাদের বন্ধু, পরামর্শদাতা। হ্যাঁ, আমি কিশোর পরামর্শদাতাদের কথা বলছি। এই পেশাটি নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে – এর ভবিষ্যৎ কেমন?
বর্তমান ট্রেন্ডগুলো লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, কিশোর পরামর্শদাতার ভূমিকা সমাজের প্রতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা, এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়েও এই ধরনের বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই নতুন নতুন পদ সৃষ্টি হচ্ছে, যা এই পেশার স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়। অনেক সময় আমরা ভেবে থাকি যে কিছু নির্দিষ্ট পেশা ছাড়া বুঝি অন্যগুলোতে তেমন সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন কোনো সামাজিক প্রয়োজন তীব্র হয়, তখন সেই সম্পর্কিত পেশার কদরও বাড়ে। কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে সহায়তা করা এমনই একটি প্রয়োজন। আগামী দিনগুলোতে এই পেশার চাহিদা এবং সম্মান উভয়ই বাড়বে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এই বিষয়ে আরও বিশদভাবে জানতে এবং এর সমস্ত দিক বিশ্লেষণ করতে, আমার সাথে থাকুন। এই পেশা নিয়ে আপনার সব কৌতূহল আজ দূর করে দেব, নিশ্চিত থাকুন!
তরুণ প্রজন্মের মানসিক চাপ: এক নীরব সংকট

কেন বাড়ছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা?
আজকের যুগে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে যেসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, তা সত্যি বলতে বেশ কঠিন। আমি নিজে যখন তাদের দেখি, তখন মনে হয়, তারা যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধে লিপ্ত। পড়াশোনার চাপ, প্রতিযোগিতার দৌড়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ঝলকানি আর পরিবারের উচ্চ প্রত্যাশা – সবকিছু মিলে তাদের মনোজগতে এক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। আমার মনে আছে, আমার এক ছোট ভাই, সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকত, কিন্তু হঠাৎ করেই সে চুপচাপ হয়ে গেল। পরে জানতে পারলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষার ফলাফল তাকে এতটাই হতাশ করেছে যে সে কারো সাথে কথা বলতেও চাইছিল না। এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এটি একটি সাধারণ চিত্র। বিশেষ করে, আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাবও কম নয়। অন্যের ‘নিখুঁত জীবন’ দেখে নিজেদের ব্যর্থ ভাবা, ফোমো (FOMO – Fear of Missing Out) তে ভোগা, সাইবার বুলিং – এসবই কিশোরদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। একটা সময় ছিল যখন আমরা বিকেলে মাঠে গিয়ে খেলতাম, গল্প করতাম। কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েরা স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে থাকে, যা তাদের ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের অভাব এবং উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সত্যি বলতে, এই নীরব সংকট আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। আমার মনে হয়, তাদের এই চাপগুলো বোঝার এবং সেগুলোকে মোকাবেলা করার জন্য আমাদের সবারই এগিয়ে আসা উচিত।
পরিবার ও সমাজের ভূমিকা
পরিবার এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অনেক বড় প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে এখনো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনার চল নেই বললেই চলে। ছেলে মানসিকভাবে দুর্বল হলে তাকে ‘নরম’ বলা হয়, আর মেয়েরা কিছু বললে তা ‘অভিনয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এই মনোভাব তরুণ-তরুণীদের আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তোলে। তারা তাদের ভেতরের কথাগুলো বলতে সাহস পায় না, কারণ ভাবে যে হয়তো তাদের দুর্বল ভাবা হবে বা গুরুত্ব দেওয়া হবে না। আমার পরিচিত অনেকেই আছেন, যারা নিজের সন্তানের মানসিক সমস্যাকে ‘খারাপ ব্যবহার’ বা ‘অতিরিক্ত আবদার’ বলে মনে করেন, কিন্তু বুঝতে পারেন না যে এর পেছনে গভীর কোনো কারণ থাকতে পারে। অথচ বাবা-মায়ের সহানুভূতিশীল আচরণ, তাদের ইচ্ছা ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়াটা কতটা জরুরি!
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও অনেক সময় এই চাপ বাড়িয়ে দেয়। মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বদলে যদি সৃজনশীলতা আর জীবনের মূল্যবোধ শেখানো যেত, তাহলে হয়তো অনেক তরুণই এই অবসাদের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারত। আমার মনে হয়, এই সামাজিক কুসংস্কার দূর করে মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কিশোর পরামর্শদাতা: একটি নতুন দিগন্ত
মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় পেশাদারদের প্রয়োজনীয়তা
আমাদের সমাজে যখন তরুণ প্রজন্মের মানসিক সংকট বাড়ছে, তখন কিশোর পরামর্শদাতাদের গুরুত্ব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই পেশাটি শুধু একটি চাকরি নয়, বরং এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব, যেখানে একজন ব্যক্তি তরুণদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করেন। অনেকেই ভাবেন, পরামর্শদাতা মানে বুঝি শুধু উপদেশ দেওয়া। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে, এটি একটি গভীর বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া, যেখানে বিশেষ প্রশিক্ষণ, সহানুভূতি এবং সঠিক কৌশল প্রয়োজন। একজন দক্ষ পরামর্শদাতা কেবল সমস্যা শোনেন না, বরং সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে সেই অনুযায়ী সমাধান দেন। বাংলাদেশে বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সংখ্যা খুবই কম, যেখানে ৩ কোটিরও বেশি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। এমনকি প্রতি ৩ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ১ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখলেই বোঝা যায়, আমাদের দেশে দক্ষ কিশোর পরামর্শদাতার চাহিদা কতটা প্রকট। আমি নিজেও দেখেছি, অনেক পরিবার তাদের সন্তানের জন্য সঠিক পরামর্শদাতা খুঁজে পান না, ফলে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাই, আমার মতে, এই পেশায় যারা আসতে চান, তাদের জন্য ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। এটি শুধু একটি ক্যারিয়ার নয়, সমাজের প্রতি একটি বড় অবদান রাখার সুযোগও বটে।
পরামর্শদাতা হওয়ার জন্য প্রস্তুতি ও দক্ষতা
কিশোর পরামর্শদাতা হওয়ার জন্য শুধু সদিচ্ছা থাকলেই চলে না, এর জন্য চাই সঠিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ। মনোবিজ্ঞান, কাউন্সেলিং বা সংশ্লিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকাটা আবশ্যক। এর পাশাপাশি, লাইসেন্সপ্রাপ্ত পেশাদার কাউন্সেলর হতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যে অতিরিক্ত দুই বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এই পেশার জন্য কিছু বিশেষ দক্ষতা থাকা জরুরি, যেমন – গভীর সহানুভূতি, ভালো শোনার ক্ষমতা, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা এবং গোপনীয়তা বজায় রাখার ক্ষমতা। কারণ, একজন কিশোর যখন তার মনের কথা বলে, তখন তাকে বিশ্বাস অর্জন করানোটা খুব জরুরি। আমার এক বন্ধু আছে, সে এই পেশায় এসেছে। আমি দেখেছি, সে কত ধৈর্য নিয়ে বাচ্চাদের সাথে মিশে, তাদের খেলার ছলে মনের কথা বের করে আনে। আর্ট থেরাপি, সঙ্গীত থেরাপি, খেলাধুলা-ভিত্তিক কাউন্সেলিং – এসব নতুন পদ্ধতিও এখন বেশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হচ্ছে। প্রযুক্তির এই যুগে অনলাইন কাউন্সেলিং এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেও তরুণদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে, যা এই সেবাকে আরও সহজলভ্য করে তুলছে। তাই যারা এই পেশায় আসতে চান, তাদের জন্য নিজেকে সব দিক থেকে প্রস্তুত রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কিশোর পরামর্শদাতা পেশার চ্যালেঞ্জ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ
বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ
কিশোর পরামর্শদাতা পেশার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হলেও, কিছু চ্যালেঞ্জও কিন্তু আমাদের সামনে রয়েছে। প্রথমত, আমাদের সমাজে এখনো মানসিক স্বাস্থ্যকে ট্যাবু হিসেবে দেখা হয়। মানুষজন এখনো ভাবেন, মানসিক সমস্যা মানেই হয়তো কোনো গুরুতর রোগ বা পাগলামি। ফলে অনেকেই পরামর্শদাতার কাছে যেতে দ্বিধা করেন বা লুকানোর চেষ্টা করেন। আমার এক বান্ধবী, যার ছেলে প্রচণ্ড জেদি হয়ে গিয়েছিল, সে প্রথমে লজ্জায় কারো কাছে যেতে চায়নি। পরে অনেক বোঝানোর পর যখন সে কাউন্সেলিং শুরু করল, তখন নিজেই বলল, ‘আগে কেন আসিনি!’ দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক দুর্বলতাও একটি বড় কারণ। মানসিক চিকিৎসা সাধারণত ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক পরিবার এই ব্যয় বহন করতে পারে না। তৃতীয়ত, দেশের গ্রামীণ অঞ্চল এবং ছোট শহরগুলোতে যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের অভাব রয়েছে। ফলে অনেক সময়ই যারা সেবার প্রয়োজন, তারা তা পান না। এছাড়াও, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বেকারত্বের মতো বিষয়গুলোও মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের গভীরতা বাড়িয়ে দেয়, যা পরামর্শদাতাদের কাজের চাপ বাড়িয়ে তোলে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব হলে, এই পেশার পথ আরও মসৃণ হবে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থান
এতসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, কিশোর পরামর্শদাতা পেশার ভবিষ্যৎ আমার কাছে খুবই আশাব্যঞ্জক মনে হয়। বর্তমানে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি বিভিন্ন সামাজিক সংস্থাতেও মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে, যেখানে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সচেতনতামূলক কর্মশালা এবং ক্যাম্পাসে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকছে। আমার দেখা মতে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখন কাউন্সেলিং সেন্টার চালু করার কথা ভাবছে, যা আগে তেমন ছিল না। সরকারও জাতীয় পর্যায়ে হেল্পলাইন এবং ক্যাম্পেইন চালু করার উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রযুক্তিগত উন্নতির সাথে সাথে টেলিমেডিসিন এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য হচ্ছে, যা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও সেবা পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।
| পেশার ক্ষেত্র | সুযোগ | স্থিতিশীলতা |
|---|---|---|
| শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়) | শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, একাডেমিক চাপ ব্যবস্থাপনা। | উচ্চ, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে বৃদ্ধি। |
| বেসরকারি সংস্থা (NGO) ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন | বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোরদের জন্য প্রকল্প, সচেতনতা বৃদ্ধি। | মধ্যম থেকে উচ্চ, প্রকল্প-ভিত্তিক কাজের সুযোগ। |
| হাসপাতাল ও ক্লিনিক | কিশোর মনোবিজ্ঞান, মনোরোগ চিকিৎসকের সহকারী। | উচ্চ, সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে বৃদ্ধি। |
| ব্যক্তিগত চেম্বার/অনলাইন প্ল্যাটফর্ম | ফ্রি ল্যান্সিং, ডিজিটাল কাউন্সেলিং সেবা। | নমনীয়, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, ক্রমবর্ধমান চাহিদা। |
| সরকারি খাত | জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। | স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান। |
এই সবকিছুর দিকে তাকালে বোঝা যায়, আগামী দিনগুলোতে কিশোর পরামর্শদাতাদের চাহিদা কেবল বাড়বেই না, বরং এই পেশা আরও বেশি সম্মানজনক এবং স্থিতিশীল হয়ে উঠবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যারা এই পেশায় আসতে চান, তারা কেবল ভালো একটি ক্যারিয়ারই পাবেন না, বরং সমাজের জন্য এক বিশাল অবদান রাখার সুযোগও পাবেন। এটা ভেবেই আমার মনটা খুশিতে ভরে ওঠে যে আমাদের তরুণ প্রজন্ম আরও ভালো থাকবে, আরও সুস্থ থাকবে!
নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বলছি: কেন এই পেশা অনন্য
আত্মতৃপ্তি আর সামাজিক প্রভাব
আমি যখন প্রথম এই কিশোর পরামর্শদাতা পেশার কথা শুনি, তখন আমার কাছে কিছুটা অস্পষ্ট ছিল এর ভবিষ্যৎ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে, আমি নিজে দেখেছি এই পেশার গুরুত্ব কতটা। আমার পরিচিত এক সিনিয়র আপু, যিনি আগে করপোরেট সেক্টরে কাজ করতেন, কিন্তু পরে তিনি কিশোর পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার মুখে প্রায়ই শুনি, “টাকা হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু যে আত্মতৃপ্তি পাই, তা অমূল্য।” আসলে, একজন তরুণকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা, তার জীবনের জটিল সমস্যা সমাধানে সাহায্য করা – এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?
যখন একটি পরিবার এসে কৃতজ্ঞতা জানায়, তাদের সন্তানের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখে, তখন মনে হয় আমাদের এই কাজটা কতটা অর্থবহ! এই পেশা শুধু আর্থিক স্থিতিশীলতাই দেয় না, দেয় মানসিক শান্তি আর সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এক অসাধারণ সুযোগ। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যখন আমরা দেখি কোনো তরুণ তার মনের ভেতরের কষ্টগুলো প্রকাশ করতে পারছে, এবং সেগুলোকে ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠছে, তখন সত্যিই একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়।
মানুষের পাশে থাকার এক অসাধারণ সুযোগ
এই পেশাটা শুধু একটি চাকরি নয়, বরং এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি অসাধারণ প্ল্যাটফর্ম। যখন কোনো কিশোর বা কিশোরী তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করে, তখন তাদের পাশে একজন বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা থাকাটা কতটা জরুরি, তা আমি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি। আমার মনে আছে, আমার এক আত্মীয়ের মেয়ে, পরীক্ষার ভয়ে এতটাই অস্থির থাকত যে ঠিকমতো খেতও না, ঘুমাতও না। তার মা-বাবা অনেক চেষ্টা করেও তাকে বোঝাতে পারছিলেন না। অবশেষে, একজন কিশোর পরামর্শদাতার সাহায্যে মেয়েটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করল। এখন সে আগের চেয়েও আত্মবিশ্বাসী। এই গল্পগুলো শুনলে আমার মন ভরে ওঠে। পরামর্শদাতারা শুধু সমস্যা সমাধান করেন না, বরং তরুণদের নিজেদের সম্ভাবনাগুলো চিনতে এবং সেগুলোকে কাজে লাগাতেও সাহায্য করেন। তারা শেখান কীভাবে জীবনের ছোট-বড় চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবেলা করতে হয়, কীভাবে মানসিক চাপ সামলাতে হয়। আমার মতে, এই পেশায় যারা আসবেন, তারা সত্যিকার অর্থেই সমাজের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবেন। তাদের হাত ধরেই হয়তো অনেক তরুণ তাদের জীবনের সঠিক পথ খুঁজে পাবে, আর এটাই তো সবথেকে বড় পাওয়া।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কিশোর পরামর্শ: ভবিষ্যতের পথ
অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা
আজকের ডিজিটাল যুগে কিশোর পরামর্শদাতা পেশাটাও কিন্তু পিছিয়ে নেই। বরং প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই ক্ষেত্রটা আরও আধুনিক আর সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। আমি নিজে দেখেছি, অনেক কিশোর-কিশোরী সরাসরি পরামর্শদাতার কাছে যেতে সংকোচ বোধ করে, কিন্তু অনলাইনে তারা অনেক খোলামেলা হতে পারে। মোবাইল অ্যাপ, এআই-ভিত্তিক চ্যাট প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন কাউন্সেলিং পরিষেবাগুলো তরুণদের জন্য ব্যক্তিগতভাবে এবং সুবিধাজনকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা অ্যাক্সেস করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। আমার এক বন্ধু তো ইদানীং শুধু অনলাইন প্ল্যাটফর্মেই কাজ করছে, আর তার গ্রাহকের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো মেজাজের পরিবর্তন ট্র্যাক করতে, স্ব-সহায়তা সংস্থান সরবরাহ করতে এবং ব্যবহারকারীদের প্রত্যয়িত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের সাথে সংযুক্ত করতে সহায়তা করে। বিশেষ করে, যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকেন, যেখানে হয়তো সরাসরি পরামর্শদাতা পাওয়া কঠিন, তাদের জন্য এই অনলাইন সেবাগুলো আশীর্বাদস্বরূপ। আমার মনে হয়, এই ডিজিটাল বিপ্লব কিশোর পরামর্শদাতা পেশাকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে এবং এর ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল করবে।
নবীনদের জন্য ডিজিটাল দক্ষতা

যারা কিশোর পরামর্শদাতা হিসেবে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য এখন ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করাটা খুবই জরুরি। শুধু প্রচলিত কাউন্সেলিং পদ্ধতি জানলে হবে না, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে কাজ করে, কীভাবে ভার্চুয়াল সেশনে গ্রাহকদের সাথে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করা যায়, সে সম্পর্কেও জ্ঞান থাকা দরকার। আমার পরিচিত অনেকেই আছেন যারা এখন টেলি-কাউন্সেলিং বা ভিডিও কলের মাধ্যমে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে এর চাহিদা আরও অনেক বেড়েছে। এই পেশায় যারা আসবেন, তাদের সাইবার নিরাপত্তা এবং ডেটা গোপনীয়তা সম্পর্কেও যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে, কারণ গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়াকে কীভাবে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও তাদের ধারণা রাখা উচিত। আমার মতে, এই ডিজিটাল দক্ষতাগুলো অর্জন করতে পারলে, একজন কিশোর পরামর্শদাতা কেবল নিজের ক্যারিয়ারকেই এগিয়ে নেবেন না, বরং সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে তার সেবা পৌঁছে দিতে পারবেন।
কিশোর পরামর্শদাতা পেশায় আয় ও সুযোগ
আর্থিক স্থিতিশীলতা ও উন্নতির পথ
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে, কিশোর পরামর্শদাতা হিসেবে আসলে কতটুকু আয় করা সম্ভব? সত্যি বলতে, এই পেশায় শুরুটা হয়তো অন্য কিছু হাই-পেয়িং জবের মতো ঝলমলে নাও হতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে আয় এবং স্থিতিশীলতা দুটোই বাড়ে। আমার দেখা মতে, যারা ভালোভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতে পারেন, তাদের চাহিদা বাজারে সবসময়ই থাকে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো থাকে, আবার ব্যক্তিগত চেম্বার বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করলে আয়ের সুযোগ অনেক বেশি। বিশেষ করে যারা ফ্রিল্যান্সিং করেন বা নিজেদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন, তারা নিজেদের মতো করে চার্জ নির্ধারণ করতে পারেন। আমি এমন অনেক পরামর্শদাতাকে চিনি, যারা প্রথমে ছোট পরিসরে কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু এখন তাদের একটা ভালো ক্লায়েন্ট বেস তৈরি হয়েছে এবং তারা বেশ ভালো আয় করছেন। এই পেশায় সততা, দক্ষতা আর মানবিকতা থাকলে আয়ের দিকটাও খারাপ হয় না।
নতুন নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র
কিশোর পরামর্শদাতা পেশা শুধু স্কুল-কলেজ বা হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর কর্মপরিধি দিন দিন বাড়ছে। আজকাল অনেক করপোরেট হাউজও তাদের কর্মীদের সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য পরামর্শদাতা নিয়োগ করছেন। এছাড়াও, বিভিন্ন এনজিও, মানবাধিকার সংস্থা, এমনকি সরকারি প্রকল্পেও এই ধরনের বিশেষজ্ঞদের চাহিদা বাড়ছে। আমার এক বন্ধু, সে একটি অনাথ আশ্রমে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ শুরু করেছিল, এখন সে ওই প্রতিষ্ঠানেরই একজন স্থায়ী পরামর্শদাতা। এছাড়া, যুব উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রোগ্রাম, সামাজিক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং গবেষণা প্রকল্পেও কিশোর পরামর্শদাতাদের ভূমিকা অপরিহার্য। বিশেষ করে, বাংলাদেশে যুব জনসংখ্যা একটি বিশাল অংশ হওয়ায়, এই পেশার চাহিদা আগামী দিনগুলোতে আরও অনেক বাড়বে। আমার মনে হয়, এই পেশায় যারা আসবেন, তারা শুধু নিজের জন্যই একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন না, বরং সমাজের জন্য একটি বড় সম্পদ হয়ে উঠবেন।
সামাজিক সচেতনতা ও কাউন্সেলিংয়ের গুরুত্ব
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারণা ভাঙা
আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, যা আমাকে খুব পীড়া দেয়। অনেকেই ভাবেন, মানসিক সমস্যা মানেই বুঝি দুর্বলতা বা লজ্জার বিষয়। কিন্তু আমার মতে, এটি শারীরিক অসুস্থতার মতোই একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। আমার এক প্রতিবেশী ছিলেন, যিনি তার সন্তানের মানসিক সমস্যার কথা কাউকে জানাতে চাইতেন না, কারণ তিনি ভয় পেতেন লোকে কী বলবে। কিন্তু এই লুকোচুরি শেষ পর্যন্ত তার সন্তানের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। একজন কিশোর পরামর্শদাতা হিসেবে আমাদের একটা বড় দায়িত্ব হলো এই ভুল ধারণাগুলো ভাঙা এবং মানুষকে বোঝানো যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়াটা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি নিজেদের ভালো থাকার জন্য একটি জরুরি পদক্ষেপ। যখন আমরা স खुलकर এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলব, তখনই মানুষ সচেতন হবে এবং কাউন্সেলিংয়ের গুরুত্ব বুঝতে পারবে। আমার মনে হয়, এই সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা সবাই মিলে কাজ করতে পারি।
কাউন্সেলিং কেন জরুরি?
কিশোর বয়সে কাউন্সেলিং কেন জরুরি, তা আমি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বারবার উপলব্ধি করেছি। এই বয়সটা জীবনের এমন একটা সময়, যখন একজন মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। পড়াশোনার চাপ, সহপাঠীদের চাপ, পারিবারিক সমস্যা, এমনকি ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা – সবকিছু মিলে তাদের মনে একটা ঝড় বয়ে যায়। এই সময়টাতে যদি সঠিক সমর্থন আর দিকনির্দেশনা না পাওয়া যায়, তাহলে অনেক কিশোরই ভুল পথে চলে যেতে পারে বা গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। কাউন্সেলিং শুধু সমস্যার সমাধান করে না, বরং এটি কিশোরদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে, মানসিক চাপ কমাতে এবং নিজেদের ভেতরের শক্তিকে চিনতে সাহায্য করে। আমি দেখেছি, যখন একজন কিশোর তার মনের কথাগুলো একজন নিরপেক্ষ পরামর্শদাতার সাথে শেয়ার করতে পারে, তখন সে কতটা স্বস্তি পায়। কাউন্সেলিং তাদের শেখায় কীভাবে সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করতে হয়, কীভাবে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে জীবনকে দেখতে হয়। আমার মতে, এই বয়সে কাউন্সেলিং নেওয়াটা শুধু একটি চিকিৎসা নয়, বরং এটি একটি বিনিয়োগ – যা তাদের ভবিষ্যৎকে আরও সুন্দর করে তোলে।
কিশোর পরামর্শদাতা: একটি সম্মানজনক ও প্রভাব সৃষ্টিকারী পেশা
পেশার সামাজিক সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা
একটা সময় ছিল যখন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না। কিন্তু এখন সময়ের সাথে সাথে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই বদলেছে। বিশেষ করে, যখন আমরা দেখছি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন কিশোর পরামর্শদাতাদের সামাজিক সম্মান এবং গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে। এখন অনেক বাবা-মা স্বেচ্ছায় তাদের সন্তানের জন্য পরামর্শদাতার খোঁজ করেন, যা আগে ভাবাই যেত না। এই পেশায় যারা আসেন, তারা কেবল নিজেদের জন্য একটি ভালো ক্যারিয়ারই তৈরি করেন না, বরং সমাজে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেন। আমি যখন দেখি একজন পরামর্শদাতা তার কাজের মাধ্যমে কতগুলো জীবনকে বদলে দিচ্ছেন, তখন সত্যিই মুগ্ধ হই। তাদের পেশাদারিত্ব, সহানুভূতি এবং দক্ষতার কারণেই এই পেশাটি আজ এত সম্মানজনক হয়ে উঠেছে। আমার মনে হয়, এই সম্মান আরও বাড়বে, কারণ সমাজের প্রয়োজন বাড়ছে।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও সামাজিক অবদান
কিশোর পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলো সত্যিই অসাধারণ। একজন পরামর্শদাতা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান করেন না, বরং একটি কিশোরের পুরো জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। তারা শেখান কীভাবে নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে সম্পর্কগুলো সুন্দর রাখতে হয়, আর কীভাবে জীবনের লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হয়। এই শিক্ষাগুলো একজন কিশোরকে সারা জীবন পথ চলতে সাহায্য করে। আমার দেখা মতে, যারা ছোটবেলায় কাউন্সেলিং পেয়েছেন, তারা বড় হয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং সফল হতে পারেন। এই পেশাটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে একজন ব্যক্তি সরাসরি সমাজের গঠনে অবদান রাখেন। তারা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ, সবল এবং মানসিক দিক থেকে দৃঢ় করে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। আমার মনে হয়, এই পেশার মাধ্যমে যে সামাজিক অবদান রাখা হয়, তা অন্য কোনো পেশার সাথে তুলনীয় নয়। তাই, যারা এই পেশায় আসবেন, তারা শুধু নিজেদের জীবনই নয়, শত শত তরুণদের জীবনকেও আলোকিত করবেন।
글을 নতুন পথে
বন্ধুরা, এই ছিল আমাদের আজকের আলোচনা কিশোর পরামর্শদাতা পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং চারপাশে যা দেখছি, তাতে আমি নিশ্চিত যে এই পেশাটি কেবল একটি চাকরি নয়, বরং এটি একটি মহান সামাজিক দায়িত্ব। একজন কিশোরের জীবনকে সঠিক দিশা দেখানো, তাকে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা – এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না। এই পেশা আপনাকে কেবল আর্থিক স্থিতিশীলতাই দেবে না, দেবে আত্মতৃপ্তি এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এক অসাধারণ সুযোগ। তাই, যারা তরুণ প্রজন্মের পাশে দাঁড়াতে চান, তাদের জন্য এই পেশাটি হতে পারে একটি দারুণ পছন্দ। আমার মন বলে, এই পথ ধরে চললে আপনি কেবল নিজের জীবনকেই নয়, শত শত তরুণদের জীবনকেও আলোকিত করতে পারবেন।
কিছু জরুরি কথা, যা জেনে রাখা ভালো
1. মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য সর্বদা নিজেকে আপডেটেড রাখুন। নতুন নতুন কৌশল এবং গবেষণাপত্র সম্পর্কে অবগত থাকা খুবই জরুরি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এতে করে আপনি আরও বেশি মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবেন।
2. নেটওয়ার্কিং এই পেশার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করুন। বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ এবং কনফারেন্সে অংশ নিন। এতে শুধু আপনার জ্ঞানই বাড়বে না, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
3. একজন পরামর্শদাতা হিসেবে নিজের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্যের চাপ মোকাবেলা করতে গিয়ে নিজের যত্ন নেওয়া ভুলে গেলে চলবে না। নিয়মিত বিরতিতে নিজের জন্যও কিছু সময় রাখুন, মনকে সতেজ রাখুন।
4. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এখন মানসিক স্বাস্থ্য সেবার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। অনলাইন কাউন্সেলিং, টেলিমেডিসিন এবং মোবাইল অ্যাপের সঠিক ব্যবহার জেনে রাখুন। এটি আপনার সেবা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে, বিশেষ করে যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকেন।
5. সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কাজ করুন। ভুল ধারণাগুলো ভাঙতে সাহায্য করুন এবং মানুষকে বোঝান যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়াটা কোনো দুর্বলতা নয়। আপনার এই প্রচেষ্টা সমাজের জন্য এক বিশাল অবদান রাখবে।
মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে
আমাদের তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য আজ এক নীরব সংকটের সম্মুখীন, যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে পড়াশোনার চাপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব আর পারিবারিক প্রত্যাশার কারণে। এই পরিস্থিতিতে কিশোর পরামর্শদাতাদের ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, যারা তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে এবং তাদের মানসিক চাপ মোকাবেলা করতে সাহায্য করেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই পেশার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে এবং এর ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। দক্ষ ও সহানুভূতিশীল পরামর্শদাতার অভাব এখনও সমাজে প্রকট, যা নতুনদের জন্য অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
যদিও মানসিক স্বাস্থ্যকে এখনো সমাজে ট্যাবু হিসেবে দেখা হয় এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতাও একটি চ্যালেঞ্জ, তবুও সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন এনজিও এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও কিশোর পরামর্শদাতাদের চাহিদা বাড়ছে। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে অনলাইন কাউন্সেলিং এবং মোবাইল অ্যাপের ব্যবহার এই সেবাকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে। এটি শুধু একটি স্থিতিশীল ক্যারিয়ারই নয়, বরং সমাজের প্রতি একটি বিশাল অবদান রাখার সুযোগও বটে। যারা এই পেশায় আসবেন, তারা শুধু আর্থিক স্বচ্ছলতাই পাবেন না, বরং আত্মতৃপ্তি এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এক অসাধারণ সুযোগ লাভ করবেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তরুণদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: কিশোর পরামর্শদাতা হিসেবে একটি স্থিতিশীল কর্মজীবন গড়া কি সম্ভব?
উ: আরে বন্ধুরা, এই প্রশ্নটা আমি যখন প্রথম এই পেশা নিয়ে ভেবেছিলাম, তখন আমার মনেও ঘুরপাক খাচ্ছিল! সত্যি বলতে কি, আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, কিশোর পরামর্শদাতা হিসেবে একটি স্থিতিশীল কর্মজীবন গড়া শুধু সম্ভবই নয়, বরং বর্তমান সময়ে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আপনারা তো দেখছেনই, চারপাশে আমাদের তরুণ প্রজন্ম কত রকম নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে – ডিজিটাল আসক্তি, পড়াশোনার চাপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব, বুলিং, আর পরিবারের মধ্যেও অনেক সময় বোঝাপড়ার অভাব। এই সবকিছুই তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে, একজন দক্ষ এবং সংবেদনশীল পরামর্শদাতার প্রয়োজনটা কতটা জরুরি, তা আমরা সবাই বুঝতে পারি। স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন এনজিও, এমনকি ব্যক্তিগত চেম্বারেও কিশোর পরামর্শদাতাদের চাহিদা বাড়ছে। আমি যখন শুরু করেছিলাম, তখন অনেকে বলতেন, “এ আর কেমন কাজ?” কিন্তু এখন দেখি, সবাই এই পেশার গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ায়, মানুষ এখন তাদের সন্তানদের জন্য সাহায্য চাইতে দ্বিধা করছে না। তাই, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই পেশার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল এবং স্থিতিশীল।
প্র: এই পেশায় সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন?
উ: দারুণ প্রশ্ন! অনেকেই ভাবেন, পরামর্শদাতা মানে বুঝি শুধু স্কুলে চাকরি। কিন্তু আমার বন্ধু, এই ধারণাটা একেবারেই ভুল। কিশোর পরামর্শদাতা হিসেবে আপনার জন্য সুযোগের দুয়ার অনেক বিস্তৃত!
আপনি শুধু স্কুল বা কলেজে নয়, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থায়, চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে, পুনর্বাসন কেন্দ্রে, এমনকি হাসপাতালগুলোতেও কাজ করতে পারবেন। অনেক এনজিও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে, সেখানেও প্রচুর সুযোগ রয়েছে। আর হ্যাঁ, আপনি যদি আমার মতো স্বাধীনভাবে কাজ করতে ভালোবাসেন, তাহলে ব্যক্তিগত চেম্বার খুলে বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও পরামর্শ দিতে পারেন। আজকাল অনেক অভিভাবক এবং তরুণরা অনলাইনেও সহায়তা খুঁজছে, বিশেষ করে মহামারীর পর থেকে তো এর চাহিদা আরও বেড়েছে। ভাবুন তো একবার, আপনার পরামর্শ একজন কিশোরের জীবন বদলে দিতে পারে!
এটা শুধু একটা চাকরি নয়, একটা দায়িত্ব, একটা সামাজিক পরিবর্তন আনার সুযোগ। আগামী দিনগুলোতে, মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, আর এর সাথে সাথে এই পেশার চাহিদা এবং সম্মান উভয়ই বাড়বে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এখন এই ক্ষেত্রে প্রবেশ করার সেরা সময়, কারণ সমাজের এই প্রয়োজনটা কেবল বাড়ছেই।
প্র: কিশোর পরামর্শদাতা হিসেবে সফল হতে কী কী দক্ষতা বা যোগ্যতা প্রয়োজন এবং কীভাবে সেগুলো অর্জন করা যায়?
উ: বাহ, এটাই তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন! আমি যখন প্রথম এই পেশায় এসেছিলাম, তখন নিজেকে এই প্রশ্নটা বারবার করতাম। শুধু বই পড়ে বা ডিগ্রি থাকলেই যে সফল পরামর্শদাতা হওয়া যায়, তা কিন্তু নয়। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, কিছু বিশেষ গুণ আর দক্ষতা না থাকলে এই পথে চলা বেশ কঠিন। প্রথমত, সহানুভূতি আর ধৈর্য। কিশোর-কিশোরীদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং তাদের অনুভূতির গুরুত্ব দেওয়াটা খুব জরুরি। তাদের জগতে প্রবেশ করার জন্য আপনার মধ্যে সংবেদনশীলতা থাকা চাই। দ্বিতীয়ত, কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা। সহজভাবে কথা বলা, জটিল বিষয়গুলোকেও তাদের বোধগম্য করে তোলাটা খুব দরকার। তৃতীয়ত, অবশ্যই মনোবিজ্ঞান বা কাউন্সেলিং-এর ওপর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞান বা কাউন্সেলিং বিষয়ে ডিগ্রি, ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট কোর্স করাটা খুব জরুরি। এটি আপনার পেশাগত জ্ঞানকে মজবুত করবে। চতুর্থত, অভিজ্ঞতা!
শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করা বা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়াটা খুবই মূল্যবান। আমি নিজেও প্রথমে ছোট একটি এনজিওতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে অনেক কিছু শিখেছিলাম। পঞ্চম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ক্রমাগত শেখার মানসিকতা। মনোবিজ্ঞান একটি পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র, নতুন নতুন গবেষণা এবং পদ্ধতি সম্পর্কে নিজেকে আপডেট রাখাটা অত্যন্ত প্রয়োজন। ওয়ার্কশপ, সেমিনার বা অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স করে আপনি আপনার জ্ঞান বাড়াতে পারেন। মনে রাখবেন, এই পেশায় সফল হতে হলে শুধু জ্ঞানের ঝুলি ভরালেই হবে না, মানুষের সাথে মিশে, তাদের সমস্যা বুঝে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাও থাকতে হবে।






